দুর্গাপূজা ২০২৬: বাঙালির উৎসব, পূজার সময়সূচি, সাজ ও কেনাকাটার সম্পূর্ণ গাইড

শিউলির গন্ধ, কাশফুলের দোলা, ঢাকের শব্দ আর নতুন পোশাকের আনন্দ।
শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ানো শুরু করলেই বাঙালির মনে যে উৎসবের ছবি ভেসে ওঠে, তার অন্যতম নাম দুর্গাপূজা।
কারও কাছে এটি মায়ের আরাধনা, কারও কাছে ছোটবেলার স্মৃতি, কারও কাছে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পূজামণ্ডপে যাওয়ার আনন্দ। আবার কারও কাছে পূজা মানেই নতুন শাড়ি, সাজগোজ, অঞ্জলি, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া আর সন্ধ্যার আলোয় মণ্ডপ ঘুরে বেড়ানো।
বাংলাদেশের বাঙালি সংস্কৃতিতেও শারদীয় দুর্গাপূজা একটি পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পূজাকে ঘিরে তৈরি হয় সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও উৎসবের আবহ।
আর তাই দুর্গাপূজা ২০২৬ সামনে রেখে এখন থেকেই অনেকের মনে শুরু হয়েছে নানা প্রস্তুতি।
কবে ষষ্ঠী? অষ্টমী কবে? অঞ্জলি কখন? দশমী কবে? পূজায় কী পরবেন? কীভাবে সাজবেন? পরিবারের জন্য কী কী কেনাকাটা করবেন?
দুর্গাপূজা ২০২৬ কবে?
২০২৬ সালের দুর্গাপূজার মূল আয়োজন অক্টোবর মাসে।
রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকার প্রকাশিত শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা ২০২৬ সময়সূচি অনুযায়ী, পূজার বিভিন্ন আয়োজন ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।
তবে মনে রাখা ভালো, বিভিন্ন মন্দির, পূজামণ্ডপ ও এলাকার নিজস্ব সময়সূচি আলাদা হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো মণ্ডপে যাওয়ার আগে তাদের প্রকাশিত schedule দেখে নেওয়া ভালো।
দুর্গাপূজা ২০২৬-এর গুরুত্বপূর্ণ তারিখ
দুর্গাপূজা ২০২৬ সময়সূচি
রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকার প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী পূজার গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো হলো:
১৬ অক্টোবর, শুক্রবার: ষষ্ঠী
ষষ্ঠীর দিন থেকেই পূজার আনুষ্ঠানিক আবহ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ষষ্ঠী পূজা: সকাল ৬:৩০ মিনিট
বোধন: বিকেল ৫:০০টা
বোধনের মধ্য দিয়ে যেন উৎসবের আবহ আরও গভীর হয়ে ওঠে। পূজামণ্ডপে তখন সাজসজ্জা, আলো আর ঢাকের শব্দে তৈরি হয় অন্যরকম পরিবেশ।
১৭ অক্টোবর, শনিবার: সপ্তমীর আয়োজন
এই দিনে প্রকাশিত সূচিতে রয়েছে:
অতিরিক্ত পূজা: সকাল ৬:০০টা
আমন্ত্রণ ও অন্যান্য রীতি: সকাল
পূজা শুরু: বিকেল ৫:০০টা
১৮ অক্টোবর, রবিবার: সপ্তমী
সপ্তমীর দিন পূজার আয়োজন আরও জমে ওঠে।
পূজা: সকাল ৫:৩০ মিনিট
পুষ্পাঞ্জলি: সকাল ৮:৪৫ মিনিট
প্রসাদ: দুপুর ১২:০০টা
সকালের অঞ্জলি ও পূজার পর পরিবারের সঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ করাও অনেকের পূজার স্মৃতির একটি পরিচিত অংশ।
মহাষ্টমী ২০২৬ কবে?
১৯ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার মহাষ্টমী।
অনেক বাঙালি পরিবারের কাছে অষ্টমী দুর্গাপূজার সবচেয়ে আবেগঘন দিনগুলোর একটি। নতুন শাড়ি পরে অঞ্জলি দিতে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে পূজামণ্ডপে সময় কাটানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া, সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে বিশেষ।
রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকার প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী:
মহাষ্টমী পূজা: সকাল ৫:৩০ মিনিট
পুষ্পাঞ্জলি: সকাল ৯:০০টা
কুমারী পূজা: সকাল ৯:৩০টা
সন্ধিপূজা: সকাল ১০:৫৮ মিনিট থেকে ১১:৪৬ মিনিট
প্রসাদ: দুপুর ১২:০০টা
অষ্টমীর অঞ্জলিতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই সময়সূচি দেখে বের হওয়া ভালো।
মহানবমী ২০২৬ কবে?
২০ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার মহানবমী।
প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী:
পূজা: সকাল ৫:৩০ মিনিট
পুষ্পাঞ্জলি: সকাল ১০:৩০ মিনিট
প্রসাদ: দুপুর ১২:০০টা
নবমীর দিন অনেকের কাছে পূজার শেষ দিকের আনন্দকে আরও একটু বেশি করে উপভোগ করার সময়। কারণ পরদিনই আসে বিজয়া দশমী।
বিজয়া দশমী ২০২৬ কবে?
২১ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার বিজয়া দশমী।
প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী:
দশমী পূজা: সকাল ৬:০০টা
পুষ্পাঞ্জলি: সকাল ৮:০০টা
পূজা শেষ: সকাল ৮:৫২ মিনিট
দশমী মানেই আনন্দের পাশাপাশি বিদায়ের অনুভূতি। কয়েকদিনের পূজা, অঞ্জলি, নতুন পোশাক, আড্ডা আর মণ্ডপ ঘোরার পর আসে সেই পরিচিত বিজয়ার আবেগ।
দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়, বাঙালির স্মৃতিও
দুর্গাপূজাকে শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর সাংস্কৃতিক দিকটির অনেকটাই বাদ পড়ে যায়।
বাঙালির জীবনে পূজার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনেক ছোট ছোট মুহূর্ত।
ছোটবেলায় নতুন জামা পাওয়ার আনন্দ।
মায়ের সঙ্গে পূজামণ্ডপে যাওয়ার স্মৃতি।
বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষা।
অষ্টমীর সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন পোশাক পরা।
অঞ্জলি শেষে প্রসাদ খাওয়া।
সন্ধ্যায় আলো ঝলমলে মণ্ডপ দেখতে বের হওয়া।
আর দশমীর দিন মনে হওয়া, এত দ্রুত পূজা শেষ হয়ে গেল কেন?
এই ছোট ছোট অনুভূতিই বছরের পর বছর ধরে দুর্গাপূজাকে মানুষের কাছে বিশেষ করে রাখে।
পূজার সাজে ফিরে আসুক বাঙালিয়ানার ছোঁয়া
দুর্গাপূজার সাজে বাঙালিয়ানার আবেদন আলাদা।
একটি সুন্দর শাড়ি, matching blouse, টিপ, কানের দুল, চুড়ি আর পরিপাটি চুলের সাজ দিয়েই তৈরি হতে পারে traditional Bengali look।
তবে পূজার সাজ মানেই ভারী makeup বা অনেক accessories নয়।
নিজের পছন্দ এবং স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী সাজই হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর।
পূজার traditional look-এর জন্য রাখতে পারেন
শাড়ি
matching blouse
টিপ
কানের দুল
চুড়ি বা বালা
ছোট handbag
comfortable footwear
lipstick
eyeliner
blush
প্রয়োজন অনুযায়ী highlighter
অষ্টমীর সাজ কেমন হতে পারে?
অষ্টমীর সাজে অনেকেই traditional Bengali look পছন্দ করেন।
শাড়ির সঙ্গে লাল বা গাঢ় রঙের টিপ, কানের দুল, চুড়ি এবং simple eye makeup একটি classic look তৈরি করতে পারে।
আবার যারা একটু modern look পছন্দ করেন, তারা traditional শাড়ির সঙ্গে minimal makeup এবং contemporary accessories ব্যবহার করতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাজ যেন আপনার নিজের style এবং comfort-এর সঙ্গে যায়।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় পূজার makeup
অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের আবহাওয়া অনেক সময় উষ্ণ ও আর্দ্র থাকতে পারে। তাই পূজার দিনে অনেকক্ষণ বাইরে থাকার পরিকল্পনা থাকলে makeup করার সময় comfort-এর বিষয়টি মাথায় রাখা ভালো।
একটি simple routine হতে পারে:
Skincare → Sunscreen → Base → Concealer → Blush → Eye Makeup → Eyeliner → Lipstick
খুব বেশি product layer করার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী product ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় বাইরে থেকেও তুলনামূলক comfortable থাকা যায়।
দুর্গাপূজার কেনাকাটায় কী কী রাখবেন?
পূজার shopping শুধু নিজের পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পরিবারের সদস্য, শিশু এবং নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস মিলিয়ে আগে থেকেই একটি list তৈরি করলে shopping অনেক সহজ হয়ে যায়।
নিজের জন্য
চুড়ি
টিপ
handbag
footwear
makeup
skincare
শিশুদের জন্য
নতুন পোশাক
জুতা
ব্যাগ
accessories
প্রয়োজনীয় personal items
ছোট উপহারের জন্য
পূজায় আত্মীয়, বন্ধু বা কাছের মানুষদের সঙ্গে দেখা হলে ছোট কোনো gift দেওয়ার জন্যও আগে থেকে কিছু রাখা যেতে পারে।

পূজার shopping আগে থেকে কেন করবেন?
পূজার ঠিক আগের সময়ে shopping করতে গেলে অনেক সময় পছন্দের design, size বা colour পাওয়া নাও যেতে পারে।
তাই আগে থেকেই ঠিক করে নিতে পারেন:
ষষ্ঠীর outfit কী হবে?
সপ্তমীর outfit কী হবে?
অষ্টমীর traditional look কী হবে?
নবমীতে কী পরবেন?
দশমীর জন্য কী রাখবেন?
এরপর প্রতিটি পোশাকের সঙ্গে accessories ও makeup-এর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো মিলিয়ে নিলে পুরো shopping plan অনেক সহজ হয়ে যায়।
দুর্গাপূজা ২০২৬ - পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর উৎসব
পূজার সবচেয়ে বড় আনন্দ সবসময় shopping বা সাজগোজে থাকে না।
অনেক সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বের হওয়া, বহুদিন পর আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা আড্ডা দেওয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি।
তাই এই পূজায় shopping-এর পাশাপাশি সময় রাখুন মানুষগুলোর জন্যও, যাদের সঙ্গে উৎসব ভাগ করে নিতে ভালো লাগে।
কারণ নতুন শাড়ি বা নতুন accessories হয়তো একসময় পুরোনো হয়ে যাবে।
কিন্তু একটি সুন্দর পূজার স্মৃতি অনেক বছর থেকে যেতে পারে।
দুর্গাপূজার পরেও থাকছে আরও কিছু আয়োজন
দুর্গাপূজা শেষ হলেও উৎসবের আবহ পুরোপুরি শেষ হয় না।
রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকার প্রকাশিত ২০২৬ সালের সূচি অনুযায়ী:
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা
২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার
পূজা শুরু: সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিট
শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা
৮ নভেম্বর ২০২৬, রবিবার
পূজা শুরু: রাত ৯:৩০ মিনিট
অর্থাৎ দুর্গাপূজার পরও শরৎ ও হেমন্তের উৎসবের আবহ আরও কিছুদিন ধরে চলতে থাকে।
দুর্গাপূজা ২০২৬-এর জন্য আপনার ছোট্ট checklist
পূজার আগে এই checklist-টি একবার দেখে নিতে পারেন:
☐ পূজার দিনের outfit ঠিক করা
☐ শাড়ি ও blouse প্রস্তুত রাখা
☐ Accessories মিলিয়ে রাখা
☐ Makeup products দেখে নেওয়া
☐ Footwear প্রস্তুত রাখা
☐ পরিবারের শিশুদের shopping শেষ করা
☐ অঞ্জলির সময়সূচি দেখে রাখা
☐ যে পূজামণ্ডপে যাবেন তাদের schedule জেনে নেওয়া
☐ পরিবারের সঙ্গে ঘোরার plan করা
☐ পূজার সুন্দর মুহূর্তগুলো ধরে রাখার জন্য camera/phone প্রস্তুত রাখা
দুর্গাপূজা ২০২৬ হোক নিজের মতো করে
দুর্গাপূজার সৌন্দর্য শুধু মণ্ডপের আলোতে নয়।
এটি আছে ঢাকের শব্দে, অঞ্জলির মুহূর্তে, শিউলির গন্ধে, নতুন শাড়ির ভাঁজে, পরিবারের হাসিতে, বন্ধুদের আড্ডায় এবং বিজয়ার বিদায়বেলায়।
কারও কাছে পূজা মানে ঐতিহ্য।
কারও কাছে পরিবার।
কারও কাছে শৈশবের স্মৃতি।
আবার কারও কাছে নতুন করে সাজা, ঘুরে বেড়ানো আর নিজের মতো করে কয়েকটা দিন উপভোগ করা।
দুর্গাপূজা ২০২৬ তাই শুধু একটি calendar date নয়। এটি বাঙালির সংস্কৃতি, স্মৃতি ও উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কয়েকটি বিশেষ দিনের নাম।
এই পূজায় নিজের পছন্দের পোশাক পরুন, নিজের মতো করে সাজুন, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটান এবং তৈরি করুন এমন কিছু স্মৃতি, যেগুলো আগামী বছর পূজা আসার আগেও মনে থাকবে।
শুভ শারদীয়।
















